ছাত্র জীবনে একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যজীবনের শুরু হয়েছিল। সৌমেন চন্দ’র ছোটগল্প ‘ইঁদুর’ তাকে অনুপ্রাণিত করে। লিখলেন, প্রথম উপন্যাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলের সাথে সম্পৃক্ত ছাত্র হুমায়ূন আহমেদের এই উপন্যাসটির নাম নন্দিত নরকে। ১৯৭০-এ লিখিত হলেও উপন্যাসটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের কারণে সহসা প্রকাশিত হয় নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত মুখপত্র নামীয় একটি সংকলনে এ উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়ার পর বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি ও সাহিত্যিক আহমদ ছফা উপন্যাসটি পুস্তকাকারে প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই উদ্যোগেরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ এর শেষ দিকে খান ব্রাদার্স এ্যাণ্ড কোং, ঠিকানাঃ ৫৭ প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১, বাংলাদেশ, এ উপন্যাসটি পুস্তকাকারে প্রকাশ করে। প্রকাশক হিসেবে কে, এম, ফারুক খানের নাম মুদ্রিত ছিল। মলাট ছিল বোর্ডের তৈরী। মূল্য রাখা হয়েছিল সাড়ে তিন টাকা। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ অংকন করেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। বইটির উৎসর্গপত্রে লিখিত ছিল, “নন্দিত নরকবাসী মা-বাবা, ভাইবোনদের”।
খান ব্রাদার্স কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম সংস্করণে এর পরিসর ছিল মাত্র ৭০ পৃষ্ঠা। অনেক ক্ষেত্রে ছোট গল্পের দৈর্ঘ্যও এর চেয়ে বেশী হয়। হুমায়ূন আহমেদ সীমিত পরিসরেই উপন্যাসের আবহ তৈরি করতে পেরেছিলেন। প্রথম উপন্যাসেই হুমায়ূন আহমেদ ব্যাপক পাঠকের মুগ্ধ মনোযোগ আকর্ষণ সক্ষম হয়েছিলেন। ব্যস! আর পেছন ফিরে দেখতে হয়নি। আসলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। প্রখ্যাত বাঙলা ভাষাশাস্ত্র পণ্ডিত আহমদ শরীফ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যামোদী মহলে কৌতূহল সৃষ্টি হয়।
শঙ্খনীল কারাগার তাঁর ২য় গ্রন্থ। তিনি দুই শতাধিক গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস প্রকাশনা করেছিলেন। তাঁর রচনার প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো ‘গল্প-সমৃদ্ধি’। এছাড়া তিনি অনায়াসে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অতিবাস্তব ঘটনাবলীর অবতারণা করতেন যাকে একরূপ যাদু বাস্তবতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর গল্প ও উপন্যাস সংলাপপ্রধান। তাঁর বর্ণনা ছিল পরিমিত এবং সামান্য পরিসরে কয়েকটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে চরিত্র চিত্রণের অদৃষ্টপূর্ব প্রতিভা তাঁর ছিল। যদিও সমাজসচেতনতার অভাব ছিল না তবু লক্ষ্যণীয় যে তাঁর রচনায় রাজনৈতিক প্রণোদনা ছিল অনুপস্থিত। সকল রচনাতেই একটি প্রগাঢ় শুভবোধ ক্রিয়াশীল থাকে; ফলে ‘ঋণাত্মক’ চরিত্রও তাঁর লেখনীতে লাভ করে দরদী রূপায়ণ। অনেক রচনার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির প্রচ্ছাপ লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস মধ্যাহ্ন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে পরিগণিত। এছাড়া জোছনা ও জননীর গল্প আরেকটি বড় মাপের রচনা যা কি-না ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তযুদ্ধ অবলম্বন করে রচিত। তবে সাধারণত তিনি সমসাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে লিখতেন। তাঁর লেখা শেষ উপন্যাস ছিল ‘দেয়াল’। সদ্য প্রায়ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “তুমি যেখানেই যাও ” কবিতার শেষ কিছু লাইন দিয়ে লেখাটা শেষ করছি-
তোমাকে যখন দেখি তার চেয়ে বেশি দেখি যখন দেখিনা
শুকনো ফুলের মালা যেরকম বলে দেয় সে এসেছে
চড়ুই পাখিরা জানে আমি কার প্রতীক্ষায় বসে আছি
এলাচের দানা জানে কার ঠোঁট গন্ধময় হবে-
তুমি ব্যস্ত, তুমি একা , তুমি অন্তরাল ভালবাসো
সন্ন্যাসীর মত করে হাহাকার করে উঠি
দেখা দাও, দেখা দাও,
পরমুর্হুতেই ফের চোখ মুছি
হেসে বলি
তুমি যেখানেই যাও সঙ্গে আছি !

No comments:
Post a Comment